
জন্ম: ১লা এপ্রিল, ১৯৩১
মৃত্যু: ১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১
জন্মস্থান: পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার চণ্ডীপুর
চিকিৎসক মোহাম্মদ মোর্তজা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আবাসিক চিকিৎসক। পেশায় চিকিৎসক হলেও তিনি ছিলেন রাজনীতি সচেতন, সমাজ সচেতন ব্যাক্তি।
প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা শেষ করে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। পর পর দুই বছর তিনি প্রথম স্থান দখল করেছিলেন। এ সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গে চলে আসেন এবং ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হল। মেডিকেলে পড়া অবস্থায় তিনি গল্প, কবিতা লিখতেন এবং তাঁর লেখা নাটক মেডিকেলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মঞ্চায়িত হত।
ছেলেবেলা থেকে দেখে আসা বৈষম্য, অসঙ্গতি, সাম্প্রদায়িকতা, দেশত্যাগ ইত্যাদি বিষয়গুলো তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলতো। ছেলেবেলায় তিনি ভাবতেন, চিকিৎসক হয়ে সাধারণ মানুষের পাশে থাকবেন, দুর্দশা দূর করবেন। কিন্তু মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষে পড়া অবস্থায় রোগীদের ইতিহাস জানতে গিয়ে দেখলেন, বেশিরভাগ রোগীই দারিদ্র্যের শিকার। তিনি বুঝতে পারলেন, চিকিৎসক হয়ে তিনি ওষুধ-পথ্য দিয়ে রোগের আরোগ্য লাভে সহায়তা করতে পারলেও, এর মূল কারণ দূর করতে না পারলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। তাই শোষণ মুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্নে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করে চলছিলেন।
চিকিৎসক মোহাম্মদ মোর্তজা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি নিয়েছিলেন যেন তিনি চাকরির কাজ শেষ করে বাকি সময় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরের বিষয় পড়াশোনা করার যথেষ্ট সুযোগ পান। গভীর নিষ্ঠার সাথে রাত দুটো তিনটা পর্যন্ত তিনি অধ্যয়ন করতেন।
সমাজের নানা অন্যায়ের সাথে আপোস করে তিনি বেঁচে থাকতে চান নি। তাই চলার পথে বারবার সংঘর্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। দৈনন্দিন জীবনে বিলাস বা ভোগের চরম বিরোধী ছিলেন তিনি। অনেক উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ডাকলে তিনি না গেলেও, রাত দুপুরে কোনো সাধারণ কর্মচারী বা ছাত্র অসুস্থ হলে তিনি ছুটে যেতেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলে বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন গ্রামে চলে যেতেন। সাধারণ মানুষদের বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা দিতেন।
প্রথম জীবনে তিনি সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজের অন্যায়গুলো তুলে ধরার কথা ভেবেছিলেন। পরে তিনি ‘গণশক্তি’ নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তিনি বাড়িতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক ক্লাস নেয়ারও ব্যবস্থা করেছিলেন।
তিনি আশা করতেন একদিন এ দেশ সত্যিকারের মুক্তি লাভ করবে, শোষণমুক্ত হবে। তিনি আশা রেখেছিলেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য “কিছু করে” তিনি অজ্ঞাত ও অখ্যাত হয়ে মরে যেতে চেয়েছিলেন। ১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ এ আরও অনেক বুদ্ধিজীবীর মতো তাঁকেও হত্যা করা হয়।